চীনে নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত শনি ও রবিবারে তিন গুন বেড়ে গেছে। ভাইরাসটি এখন উহান থেকে অন্যান্য বড় বড় শহরেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে প্রতিদিনই করোনাভাইরাসে মৃত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মৃত্যুর ছায়া নেমে এসেছে যেন পুরো শহরে। এর মধ্যে বিভিন্ন ঘটনা যেন মানুষের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে ফেলছে। তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছে উহানের ইয়ান চেংয়ের জীবনে।

চীনে বাদুড় থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা। সোমবার এ বিষয়ে দুটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার’ সাময়িকীতে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, সার্স (সেভার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) ভাইরাসের মতো করোনাও বাদুড় থেকে ছড়িয়েছে।

প্রথম গবেষণাটি করেছেন, চীনের ফুদান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ইয়ং জেন জং ও তাঁর এক সহকর্মী। তাঁরা গবেষণার জন্য এক রোগীর ফুসফুস থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। ওই রোগী গত ২৬ ডিসেম্বর জ্বর-কাশির লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই রোগী সাউথ চায়না সিফুড হোলসেল মার্কেটে কর্মরত ছিলেন।

ওই ব্যক্তির থেকে নেওয়া নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সার্স ভাইরাসের সঙ্গে করোনাভাইরাসের মিল রয়েছে। এই করোনার জিনোমে সিকুয়েন্সের সঙ্গে সার্সের জিনোম সিকুয়েন্সের ৮৯ দশমিক ১ শতাংশ মিলে গেছে। এর আগে চীনে ২০০৩ সালে সার্স ছড়িয়ে পড়েছিল, যা ছড়িয়েছিল বাদুড় থেকে।

চীনে নতুন করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৫ জনে, আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২০ হাজার।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার একদিনেই এ ভাইরাসে মারা গেছেন ৬৪ জন; নতুন ৩২২৫ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৪৩৮ জনে।

রয়টার্স জানিয়েছে, গত বছরের শেষ দিন চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি ধরা পড়ার পর থেকে এক দিনে এত বেশি মৃত্যু ও নতুন রোগীর তথ্য আর আসেনি।

চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে ফিলিপিন্স ও হংকংয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে নতুন এ করোনাভাইরাসে, যাকে বলা হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস। অন্তত ২৫টি দেশ ও অঞ্চলে অন্তত দেড়শ মানুষের দেহে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন দেশে মানুষ থেকে মানুষে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবর আসতে থাকায় গত ৩০ জানুয়ারি এ ভাইরাস নিয়ে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। 

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক উপসর্গ হয় ফ্লু বা নিউমোনিয়ার মত। কিন্তু বয়স্ক এবং অন্য অসুস্থতা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ সংক্রামক রোগ হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। এর কোনো প্রতিষেধকও মানুষের জানা নেই। 

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজেস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও টিকা কেন্দ্রের পরিচালক ন্যান্সি মেসোনিয়ার বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে চীনের বাইরে এ ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ঘটনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় নিজেদের ভুল আর ঘাটতির কথা স্বীকার করে নিলো চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব।

দ্যা পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটি বলেছে, জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের আরও উন্নতি করতে হবে।

এর মধ্যে বন্যপ্রাণীর বাজারে বড় ধরণের অভিযান চালানোর আদেশ দেয়া হয়েছে।


করোনাভাইরাস: মধ্যবয়সীদের ঝুঁকি বেশি

নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের গড় বয়স ৫৫ বছর। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ বেশি। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়। ভাইরাসের জিন পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায় এমন রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে।

নতুন করোনাভাইরাস নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে করা পৃথক কিছু গবেষণায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। চীনের কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা এসব গবেষণা করেছেন। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট-এ তাঁদের পৃথক ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে।

চীনের উহান জাইনিনতান হাসপাতালে ১৪ বছরের বেশি বয়সীদের চিকিৎসা হয়। এই হাসপাতালে ১ থেকে ২০ জানুয়ারির মধ্যে ভর্তি হওয়া ৯৯ জন রোগী নিয়ে গবেষণা করেছে একটি দল। রোগীদের প্রত্যেকের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। এদের মধ্যে পুরুষ ছিল ৬৭ জন, আর নারী ৩২ জন। গবেষকেরা রোগতাত্ত্বিক, জনমিতিক, চিকিৎসাসংক্রান্ত, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসংক্রান্ত, ব্যবস্থাবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।

ওই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোগীদের গড় বয়স ছিল ৫৫ দশমিক ৫ বছর। ৫০ শতাংশ রোগীর অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ ছিল। এঁদের মধ্যে জ্বর ও কাশি ছিল যথাক্রমে ৮৪ ও ৮২ শতাংশের। ৩১ শতাংশের ছিল ঘন ঘন শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা। অন্যদিকে ৭৪ শতাংশের নিউমোনিয়াও দেখা দিয়েছিল। গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগা পুরুষদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।

রোগের লক্ষণ বোঝার জন্য ২ জানুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৪১ জন রোগীকে নিয়ে আরেকটি গবেষণা হয়েছে। রোগীদের মধ্যে ৩০ জন ছিল পুরুষ। তাদের ২০ শতাংশের ডায়াবেটিস, ১৫ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ ও ১৫ শতাংশের হৃদ্‌রোগ ছিল।

আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশের জ্বর ও ৭৬ শতাংশের কাশি ছিল। ক্লান্তি ও অবসাদ ছিল ৪৪ শতাংশের। এক্স-রেতে দেখা যায়, ৪১ জন রোগীর প্রত্যেকেরই নিউমোনিয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে ১৩ জন রোগীকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ছয়জন মারা যায়।

করোনাভাইরাস: প্রচলিত ধারণা বনাম বাস্তবতাঃ

২০১৯-এনসিওভি’ নামের করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ভুগছে বিশ্ব। কারণ এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান শহর থেকে শুরু হওয়া এই রোগ এখন চীনের বাইরেও বেশ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। 

নতুন এই ভাইরাস সম্পর্কে নানা ধারণা মানুষের মধ্যে রয়েছে। যেগুলোর বেশিরভাগই সঠিক নয়। এরকম কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা নিয়ে এ প্রতিবেদন।

প্রচলিত ধারণা: সার্জিক্যাল মাস্ক করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেবে।

বাস্তবতা: সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কের ভেতর দিয়ে ভাইরাস সহজেই প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ ধরনের এ৯৫ রেসপিরেটর মাস্ক আপনাকে এ ক্ষেত্রে সুরক্ষা দিতে পারে। আর হ্যাঁ, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখাই হলো সেরা অভ্যাস।

প্রচলিত ধারণা: বয়স্করা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

বাস্তবতা: যেকোনো বয়সের মানুষ নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ লোকজনের এই ভাইরাসে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

প্রচলিত ধারণা: করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যু নিশ্চিত। 

বাস্তবতা: এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ২.০৯ শতাংশ মানুষ মারা গেছেন।

প্রচলিত ধারণা: করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হবে।

বাস্তবতা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, অ্যান্টিবায়োটিক করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী না। অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়ার চিকিৎসা করে। আর করোনা হচ্ছে ভাইরাস। ফলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হবে না।

প্রচলিত ধারণা: বিশ্বে এখন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভাইরাস করোনা।

বাস্তবতা: মহামারী আকারে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবর উদ্বেগজনক। কিন্তু এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভীতিকর ভাইরাস কিন্তু ২০১৯-এনসিওভি নয়। বরং সেটি হচ্ছে ফ্লু। 

প্রচলিত ধারণা: বাতাসে করোনাভাইরাস রয়েছে।

বাস্তবতা: জীবাণু সাধারণত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। ভাইরাস হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির ফোঁটা পড়েছে এমন কিছুতে স্পর্শ করার পর নিজের নাকে, মুখে বা চোখে হাত দেওয়া উচিত নয়।

প্রচলিত ধারণা: পোষা প্রাণী করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে।

বাস্তবতা: এখন পর্যন্ত এমন প্রমাণ নেই যে, বাসার পোষা প্রাণী নতুন এই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তবে পোষা প্রাণী স্পর্শ করার পর সাবান দিয়ে ভালোমতো হাত ধুয়ে ফেলা উচিত। 

প্রচলিত ধারণা: করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে জম্বিদের মতো (ভয়ানক প্রাণী) আচরণ করে মানুষ।

বাস্তবতা: ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তিদের জম্বির মতো আচরণ করায় না। কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই বলা হয়েছিল যে, ভাইরাসটি নিয়ে গবেষণার সময় তা অসাবধানতায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই সূত্রে মালয়েশিয়ার কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম ব্যবহারকারী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জম্বিদের মতো হেঁটে মারা গেছেন- এমন গুজব রটায়। 

প্রচলিত ধারণা: আমদানিকৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে।

বাস্তবতা: পণ্যদ্রব্য থেকে করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে এমন কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি।

ভুয়া তথ্যের ব্যাপারে সচেতন থাকুন

বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন: ফেইসবুক, টুইটার, ইউটিউব এবং টিকটকে ২০১৯-এনসিওভি করোনা ভাইরাস নিয়ে প্রচুর ভুয়া এবং বিভ্রান্তমূলক পোস্ট রয়েছে। তাই সঠিক উৎস থেকে তথ্য নিশ্চিত হয়ে নিজেকে সচেতন রাখুন।