ফ্রিল্যান্সিং/আউটসোর্সিং ট্রেনিং সেন্টারগুলো যে ভাবে প্রতারণা করে। বিস্তারিত আর্টিকেল এর ভেতর প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রথম কথা হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং কিংবা আউটসোসিং কিভাবে করতে হয় সেটা শেখার জন্য কোন ট্রেনিং সেন্টারে যেতে হয় না। আপনি ফ্রিল্যান্সিং করতে হলে আপনাকে একটা স্কিল ক্যাটাগরিতে ভালো দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ট্রোনিং সেন্টারে সেটার জন্যই যাবেন।

বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং এর জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয় ক্যাটাগরি হচ্ছে গ্রাফিক ডিজাইন, ফটো এডিটিং, এস.ই.ও, ডিজিটাল মার্কেটিং, এডমিন সাপোর্ট, ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব প্রোগ্রামিং, ইউ.আই/ইউ.এক্স ডিজাইন, সফটওয়ার প্রোগ্রামিং ইত্যাদি।

এসকল বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য অপনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হবেন। সে ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিং এর ট্রেনিং সেন্টারগুলো যেভাবে প্রতারণা করে সে সকল বিষয়ে আপনাকে সচেতন হতে হবে। আসুন কমন কিছু বিষয়ে আলোচনা করা যাক, যাতে করে আপনি প্রতরণার হাত থেকে রক্ষা পান এবং ট্রেনিং সেন্টারের কোর্স থেকে বেস্ট আউটপুট পেতে পারেন।

আয় করে কোর্স ফী পরিশোধ করুন” – সাবধান হোন।

গ্রাফিক ডিজাইন বা অন্য যে কোন বিষয়ে শিখে আয় করে কোর্স ফী পরিশোধ করুন। আগে শিখুন পরে কোর্স ফি প্রদান করুন। এমন লোভনীয় বিজ্ঞাপন বর্তমানে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অফার করছে।

ইতি মধ্যে বেশ কয়েকজন স্টুডেন্ট অভিযোগ করে কোর্স ফি পরিশোধের এই পদ্ধতিকে অনেকটা প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এর মূল কারণ হচ্ছে এই পদ্ধতিতে কোর্স ফি অনেক বেশি হয় এবং কোর্স করার জন্য এস.এস.সি/এইছ.এস.সি সার্টিফিকেটেরে মূল কপি জমা দিতে হয়। পে করতে হবে ভেবে অনেকেই কোর্স সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝে উঠার আগেই ভর্তি হয়ে যান। কিন্তু অনেকেই বুঝতে পারেন না যে এই কোর্সটি তার জন্য বেস্ট ফিট ছিল কিনা। ১-২ টা ক্লাস করার পর যখন বুঝতে পারেন তখন তার কিছুই করার থাকে না।

এছাড়া আপনি নিজেকে চ্যালেঞ্জ হিসাবেও এমন পদ্ধতিতে কোর্স নিতে পারেন। তবে আপনি এটা স্বীকার করেন বা না করেন একটা কোর্সের ২০-৫০ জনের মধ্যে ফলপ্রসূ ভাবে শিখতে পারা স্টুডেন্টের সংখ্যা নিতান্তই কম। এক দুই জনের সফলতার গল্প শুনে ভাবনা চিন্তা না করেই সিদ্ধান্ত নিবেন না।

কারণ জমা দেওয়া সার্টিফিকেট সম্পূর্ণ কোর্স ফি পরিশোধ করেই তুলতে হয়। আপনি উক্ত কোসের্ নিদির্ষ্ট ক্লাশ থেকে শিখে আয় করতে পারেন বা না পারেন।

তাই আমার সাজেশন হচ্ছে আপনি যে স্কিল সেট নিয়ে নিজেকে দক্ষ করতে আগ্রহী সেটা নিয়ে আগে ভালোভাবে স্টাডি করেন। ইউটিউবে সকল স্কিল সেট নিয়ে অসংখ্য টিউটোরিয়াল রয়েছে। প্রাথমিক ধারণাটুকু আগে থেকে নিয়ে রাখতে পারেন।

আগে থেকে বেসিক জানার সুবিধাঃ

প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানই একটা কোর্সের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্লাস করিয়ে থাকে। সেটা ৩৫ থেকে ৪৫ হয়ে থাকে। তবে সত্য কথা হচ্ছে আপনি মোটামুটি বেসিক না জানলে এই সীমিত সংখ্যক ক্লাস থেকে বেস্ট আউটপুট পাওয়া দূরহ হবে। সেক্ষেত্রে বেসিক জানা থাকলে আপনি ভালো সুবিধা পাবেন। যেখানে আপনার দুর্বলতা সে সকল বিষয়ে মেন্টরের সাথে আলোচনা করে সমাধান পেতে পারেন।

কোর্স মডিউল প্রতারনাঃ

কোন কোর্স শুরু করার আগে কোর্স মডিউলে কি কি থাকবে জেনে নিন। আমার কাছে বেশ কিছু স্টুডেন্ট অভিযোগ করেছেন তারা গ্রাফিক ডিজাইনের কোর্সের ভর্তি হয়েছেন কিন্তু তাদের কোর্স শেষ হয়েছে টুল শিখানোর মধ্যদিয়ে। এডভান্স ডিজাইন শিখার জন্য আলাদা কোর্স নেওয়ার কথা বলা হয়!

ফ্রি সেমিনার প্রতারণা !!! অংশ গ্রহণ করেন কিন্তু ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিবেনঃ

বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই নতুন স্টুডেন্ট সংগ্রহের জন্য ফ্রি সেমিনার আয়োজন করে থাকে। সেখানে বেশিরভাগ সময়ই একটা স্কিলের পজিটিভ দিক এবং সফলতার গল্প বলাহয়। যেগুলো নতুনদেরকে বেশ আগ্রহী করে তোলে। সুতরাং ফ্রি সেমিনারে অংশ গ্রহণ করে বুঝার চেষ্টা করেন সে সকল স্কিল নিয়ে। সফলতার গল্প এবং সম্ভাবনা দেখেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিবেন না। ফ্রি সেমিনার থেকে আপনি এবং প্রতিষ্ঠান উভয়েই যেন লাভবান হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখবেন। তবে সেমিনারে অংশগ্রহণ করে কিছু ছাড় পেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিবেন না।

ফ্রিল্যান্সিং শেখা অবস্থায় মার্কেটপ্লেসে একাউন্ট খুলবেন না! সাবধানঃ

কিছু কিছু ট্রেনিং সেন্টার কয়েকটা ক্লাস করিয়েই মার্কেটপ্লেসে একাউন্ট খুলতে বলে। আমি আপনাকে সাবধান করছি। যদি ফ্রিল্যান্সার হতে চান আন্তর্জাতিক স্টান্ডার্ড কাজ শিখা ছাড়া কিংবা সেই মার্কেটপ্লেস সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝা ছাড়া একাউন্ট খুলবেন না। কারণ আপনি আপনার নামে একবারই একাউন্ট খুলতে পারবেন। প্রত্যেক মার্কেটপ্লেসে আইডি কার্ড দিয়ে ভেরিফাই করতে হয়। যদি কোন কারণে একাউন্ট ব্যান হয়, তাহলে সেই মার্কেটে আপনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

প্রত্যেক আউটসোসিং ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস সম্পর্কে ইউটিউবে বাংলায় এবং ইংলিশে যথেষ্ট রিসোর্স রয়েছে। সুতরাং একাউন্ট ওপেন করার আগে ইউটিউবে ওই মার্কেটপ্লেস নিয়ে ভালোভাবে জানার চেষ্টা করুন।

কিভাবে ভালো আউটসোর্সিং/ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান চিনবেনঃ

একটু ভাবুন, আপনাকে সফল হওয়ার মেন্টরশিপ সে-ই দিতে পারবে, যে ঐ কাজে নিজে সফল। কিন্তু যে নিজেই কাজ করেনা বা করেনি, সে কি করে আপনাকে ট্রেইনিং দিতে পারবে?

আর যে দক্ষ, যে নিজে সফল, অনেক টাকা আয় করে, অনেক রেপুটেশন, সে কেন ট্রেনিং ব্যবসা করে ৫-১০ হাজার ইনকাম করতে আসবে? সে আরেকজনকে সফল করার মূল-মন্ত্র দিতে পারলে সে নিজে তো লক্ষ-লক্ষ আয় করার কথা। তার এত সময় কোথায়?

এসব ট্রেনিং সেন্টারের মালিক / ট্রেইনারদের ব্যাকগ্রাউন্ড খোঁজ নিলে দেখবেন, তারা নিজেরা অন্য ট্রেনিং সেন্টারে কোর্স করেছিল, নিজেরা ঐ কাজে দক্ষ হতে পারেনি, সফল হতে পারেনি। তো কি করবে? যা শিখেছে তা অন্যকে শিখিয়ে অনেক টাকা ইনকাম করা যায়, আর ট্রেনিং করার জন্য অর্থলোভী মানুষের তো দেশে অভাব নেই।

ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা ট্রেইনিং সেন্টার থেকে দূরে থাকুন, নিজে শেখার চেষ্টা করুন।

বাংলাদেশের ট্রেইনিং সেন্টার গুলো অবৈধ-সাইবারক্রাইমকে ফ্রিল্যান্সিং বলে চালিয়ে দেয়, আর এ সম্পর্কে জানেনা এমন ছেলে মেয়েদের কাজ করায় তাদের প্রতিষ্ঠানে।

যেমনঃ

ক্যাপচা এন্ট্রি, ফেসবুক ফেইক লাইক, পিটিসি , সি.পি.এ মার্কেটিং , ফরেক্স ট্রেডিং , Clicksense, trafficmonsoon , Bet365 আর এখন নতুন নতুন যুক্ত হচ্ছে অবৈধ-সাইবারক্রাইম ভিন্ন নামে।

এগুলো পিওর সাইবারক্রাইম এবং অবৈধ। এগুলোর সাথে ফ্রিল্যান্সিং এর কোন যোগসূত্র নেই। বছর কয়েক আগে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং এর নামে এসব অবৈধ কাজ হচ্ছে বলে বিশ্বের নামকরা কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রতিবেদনও আসে।

বাংলাদেশের ৯০% আই টি প্রতিষ্ঠান বা যে সব প্রতিষ্ঠান আউটসোর্সিং ও ফ্রিলান্সিং কাজ শিখায় তারা ধান্দা বাজ ।

( আমি অনেক দিন ধরে এই বিষয় রিসার্চ করেছি )

ভালো প্রতিষ্ঠান চিনতে হলে আপনি যে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে ইচ্ছুক তদের নিয়ে একটু অনলাইনে রিসার্চ করুন। একই স্কিল ক্যাটাগরিতে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ শিখেছে এমন এক জনের পরামর্শ নিন। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ থেকে মতামত জানতে পারেন। তাদের অনলাইন রেপুটেশন (ফেসবুক এবং গুগল রিভিউ) দেখতে পারেন এবং কত বছর যাবত প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে সেটাও দেখতে পারেন।

এমন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবেন না যারা আপনাকে বিক্রি করে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। হাসবেন না, এ কথা বলছি কারণ আমার অফিসে একদিন এক স্টুডেন্ট এসে বলল সে একটা ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলো বাট তার কোর্স শেষ হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠানটি মার্কেট আউট এবং তাকে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়!

আপনারা ট্রেনিং সেন্টার গুলোতে কাজ শিখতে যান কোন সমস্যা নেই। ট্রেনিং সেন্টারের যে শিক্ষক আপনাকে কাজ শেখাবে।

আগে তাকে ভালো ভাবে চেক করুন।

যেমনঃ

আপনার শিক্ষকের ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসের প্রোফাইল চেক করুন। তারপর দেখুন আপনার শিক্ষকের কাজের রেটিং গুলো। কতগুলো প্রজেক্ট শেষ করেছে ও তার রিভিউগুলো।

আপনার শিক্ষকের প্রোফাইলে যদি দেখেন ৫০ প্লাস রিভিউ নাই। তা হলে তার কাছ থেকে কাজ শিখা থেকে বিরত থাকুন। এবং ১০০ হাত দূরে থাকুন।

সব থেকে জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস গুলো হলঃ

1. Upwork

2. Freelancer

3. Fiverr

4. Guru

5. PeoplePerHour

6. iFreelance

7. 99Designs

8. SimplyHired

*পরামর্শঃ

*তাবিজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা দিয়ে কোর্স না কিনে।

সেই টাকা দিয়ে বাসায় ওয়াইফাই লাইন নিন বা আপনার ব্যবহৃত সিম কার্ডের ডাটা প্যাক কিনুন।

*তার পর গুগল এবং ইউটিউব এ দুটি সোর্স ভালো ভাবে কাজে লাগান।

*ট্রেনিং সেন্টার থেকে দূরে থাকুন, নিজে শেখার চেষ্টা করুন।

*ট্রেইনিং সেন্টারে যদি যেতেই হয়, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, ট্রেক রেকর্ড চেক করুন। প্রয়োজনে এই খাতে সফল কারও পরামর্শ নিন।

*অল্প দিনে অনেক টাকা আয় করার কথা যারা বলে তাদের থেকে দূরে থাকুন।

এত কিছুর পরেও আপনিই কিন্তু উইনার!

যে যত প্রতারণাই আপনার সাথে করুক না কেন, এগুলো সবই আপনার জন্য শিক্ষা! এই শিক্ষা গুলো আপনার জীবনে বেশ কাজে লাগবে। কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই আপনি ভালো কিছুর সন্ধান পাবেন। শিখতে হলে আপনাকে সেটার জন্য ব্যয় করতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যয় করাটাই হচ্ছে আপনার জীবনের সেরা ইনভেস্টমেন্ট। সেই বিনিয়োগ গুলোই হচ্ছে আপনার সময়, টাকা, কঠোর পরিশ্রম ইত্যাদি।

সবথেকে বড় কথা গুগলকে আপনা সঙ্গী বনিয়ে নিন! আপনি অনলাইনে ক্যারিয়ার গড়তে হলে পাশের বাড়ীর ভাই বা মামার থেকে শুনেই কোন ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হবেন না। বরং অনলাইনে যে কোন তথ্য নিজে থেকে খুজে বের করা জানতে হবে। এটা সবথেকে বড় স্কিল। পাশা পাশি ইংলিশ কমিউনিকেশন দক্ষদা বাড়ানোর চেষ্টা করুন।

আমার এই পোস্টটি যদি আপনি শেয়ার করে দেন। তাহলে, অন্তত আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা আপনার বন্ধুটি ট্রেনিং প্রতারণার হাত থেকে বাঁচবে।