এটি আমার অনেক পুরাতন কম্পিউটার। আজকে হঠাত একটা পুরাতন ফোল্ডারে কিছু ছবি সামনে পড়ল। কিছু স্মৃতিও ভেসে উঠল মনের আয়নায়।
.
মাস তিনেক আগে আমার চেয়ে ২-৩ বছরের সিনিয়র এক ভদ্রলোকের সাথে বাজারে দেখা। পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আমার জামা টেনে ধরে বলছেন, আরে, মমতাজ সাব না?
আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে পারি নি। একদম থুর থুরা বৃদ্ধ চেহারা। মাথায় টুপি। সাদা দাড়ি। সাদা ভ্রু। মুখে দাঁত নেই। চাপা ভাঙ্গা। পরিচিতের কোন চিহ্নই পেলাম না। বলেন যে, সত্যি চিনতে পারছেন না? এমন সময় পাশ থেকে পরিচিত এক কলীগ বললেন, স্যারকে চিনতে পারছেন না স্যার? ইনি অমুক। এক সময় আমরা তিনজনেই অমুক শাখায় চাকরি করতাম। ইনি আমাদের ম্যানেজার ছিলেন? কি স্যার, মনে পড়ছে?

অবাক হয়ে গেলাম। কাছাকাছি বয়সের মানুষ। অথচ এমন চেহারা হয়ে গেছে? বাজার থেকে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে আমার কি কি মনে পড়ল।

১৫ বছর আগের কথা। উনি অফিস শেষ করে প্রতিদিন সন্ধ্যায় চলে যেত বিভিন্ন এলাকায় ক্লাবে বা কোন রিক্সার গ্যারেজের পিছনে বা কোন মিল ফ্যাক্টরির ভিতরে । প্রতিদিন তাস খেলত। এক প্রকার জুয়া। পানি পুনিও খেত। আরো কিছু দোষের কথাও শুনেছি। আল্লাহ মাফ করুন। অফিসের একটা ঘটনা বলি।
.
উনি সেই ব্যাংক শাখায় জয়েন করার আগে আমি কিছু দিন অস্থায়ী ম্যানেজার ছিলাম। ১৮-২০ বছরের একটা হত-দরিদ্র ছেলে সেই অফিসে অস্থায়ী ঝাড়ুদার হিসাবে কাজ করত। অফিস খোলার আগে তার কাজ শেষ করত বাকি সারা দিন লোকের ফরমাইশ খাটতো । তারপর ভিড়ের সময় ট্যাক্সের টাকা জমা দেয়ার ব্যাপারে মানুষকে হেল্প করত। সারা দিনে তার দুই চারশ টাকা ইনকাম হতো। পুরাটাই বৈধ ইনকাম।
.
উনি জয়েন করার পর বলে যে, তুই অফিস খোলার আগে কাজ শেষ করে চলে যাবি। অফিস টাইমে আমি যেন ত্রিসীমানায় তোকে না দেখি। ৩-৪ দিন ছেলেটা মাঝে মাঝে অফিসে ঢুকে বলত আর কান্না করত। ঘরে তার বৃদ্ধ মা এবং ছোট দুই ভাই বোন আছে। সেই একমাত্র কামাইদার। অনেক মায়া লাগল। একদিন আমি দুই তিনজন সিনিয়র অফিসার সাথে নিয়ে ম্যানেজারকে অনুরোধ করলাম তাকে এই ভাবে খেদিয়ে দেয়া না হোক। বলে যে, অসম্ভব । হবে না।
.
৪-৫ দিন পর আমাকে বলল, আপনি অনেক সিনিয়র মানুষ। আপনার কথাটা রাখব ভাবছি।
.
পরের দিন ছেলেটি আগের মতই কাজে নেমে পড়ল। আগের চেয়ে একটু জোরেই কথা বলছিল। তার স্পীড আগের চেয়ে একটু বেশিই দেখা গেল।

ক্যাশ ইনচার্জ মজার মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, স্যার কি বুঝলেন? আপনি মুরুব্বী মানুষ তাই আপনার কথাটা ম্যানেজার সাব রেখেছে। আসল ঘটনা প্রতিদিন ছেলেটি তাকে তিন শ’ টাকা দিবে এই চুক্তিতে সে নিজেই সমাধান করেছে।
.
হায়রে জীবন। দুই দিনের দুনিয়া। কি কি করে মানুষ।